ঢাকার প্রতিদিনের নীরব শত্রু মশা। সকাল হোক কিংবা গভীর রাত, রাজধানীর অলিগলি, ফ্ল্যাটবাড়ি, অফিস, এমনকি হাসপাতালেও মশার দাপট এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। নাগরিক জীবনের স্বাভাবিক ছন্দকে ব্যাহত করে এই ক্ষুদ্র পতঙ্গ ক্রমেই রূপ নিচ্ছে বড় জনস্বাস্থ্য সঙ্কটে। বর্ষা মৌসুম এলেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তবে এবার শীত মৌসুমেও মশার উপদ্রব কমেনি, যা বিশেষজ্ঞদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে মশার বংশবিস্তার এখন বছরজুড়েই অব্যাহত। দুই সিটি করপোরেশন নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম চালানোর দাবি করলেও, বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। বর্তমানে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার সংখ্যা কিছুটা কমলেও কিউলেক্স মশার সংখ্যা বাড়ছে। এই বৃদ্ধি আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। ফলে রাজধানীবাসীকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হবে। এমন আশঙ্কার কথাই উঠে এসেছে ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডুরা) আয়োজিত মশার উপদ্রব ও নাগরিক ভোগান্তি শীর্ষক এক আলোচনা সভায়। এতে সভাপতিত্ব করেন ডুরার সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান মোল্লা। সঞ্চালনা করেন ডুরার সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর, কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. কবিরুল বাশার বলেন, কিউলেক্সের উত্থান এবং এডিসের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন দুটিই প্রমাণ করে যে ঢাকার মশা সমস্যা আর মৌসুমি নয় এটি একটি কাঠামোগত ও বৈজ্ঞানিক সঙ্কট। বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য উপেক্ষা করলে তার মূল্য দিতে হবে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য দিয়ে। তবে একটি অস্বস্তিকর সত্য স্বীকার করতেই হয় নাগরিক অংশগ্রহণ ছাড়া ঢাকাকে মশামুক্ত করা অসম্ভব। প্রশাসন তার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না, আবার নাগরিক উদাসীনতাও সমানভাবে দায়ী। বাড়ির ছাদে জমে থাকা পানি, অব্যবহৃত পাত্র, খোলা পানির ট্যাংক এসব ছোট অবহেলাই বড় বিপর্যয়ের জন্ম দেয়। বর্তমানে এডিস মশা কমলেও কিউলেক্স বাড়ছে এবং আগামী মার্চ মাসে এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাবে। ভোগান্তি নগরবাসীকে পোহাতে হবে। তাই এখনই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নাগরিকদের সচেতন হওয়া জরুরি। কিউলেক্স মশা সাধারণত রোগ ছড়ায় না এই ভুল ধারণার কারণে দীর্ঘদিন অবহেলিত। অথচ এই মশাই ফাইলেরিয়া রোগের বাহক এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে অসহনীয় করে তোলে। রাতে ঘুমানো থেকে শুরু করে হাসপাতালে রোগীর কষ্ট সবখানেই কিউলেক্সের আধিপত্য।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, মশার সমস্যা থেকে সাময়িক নয়, স্থায়ী মুক্তি প্রয়োজন। অপরিকল্পিত নগরায়ন, বাসস্থান, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এই সমস্যার মূল অন্তরায়। পরিকল্পনাহীনভাবে কাজ শুরু করলে পরবর্তী কোনো উদ্যোগই কাক্সিক্ষত ফল দেবে না। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাধ্যতামূলক; এটি ছাড়া কোনো উদ্যোগই কার্যকর হবে না। আমরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি, তবে নাগরিকদের অংশগ্রহণ ছাড়া সফলতা সম্ভব নয়। সবাই মিলে চেষ্টা করলে মশামুক্ত ঢাকার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব।