“ভেজাল ঔষধের বিষাক্ত সাম্রাজ্য ! আয়ুর্বেদিক-ইউনানি ঔষধের আড়ালে মৃত্যুফাঁদ:আই,কে আয়ুর্বেদিক ঔষধালয় ও আই,কে ল্যাবরেটরীজ নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ !
দেশের কোটি মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন নিরাপদ ও কার্যকর ওষুধ নিশ্চিত করার কথা, তখন অভিযোগ উঠেছে—কিছু বিতর্কিত আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ধরে জাতীয় ফর্মুলারির বাইরে গিয়ে নানা রাসায়নিক, কৃত্রিম রং (কালার), ফ্লেভার এবং কথিত কার্যকারিতা বৃদ্ধিকারী উপাদান ব্যবহার করে ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। আর এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে ওষুধ প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা নীরব আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে আসছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি আই,কে আয়ুর্বেদিক ঔষধালয় লিমিটেড (উৎপাদন লাইসেন্স নং: আয়ু-০৮৬) এবং আই,কে ল্যাবরেটরীজ (ইউনানি) (উৎপাদন লাইসেন্স নং: ২৯৮) এর বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠান দুটি বাংলাদেশ জাতীয় আয়ুর্বেদিক ফর্মুলারী ও জাতীয় ইউনানি ফর্মুলারীর নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ না করে নিজস্ব রেসিপি ও অননুমোদিত উপাদান ব্যবহার করে ওষুধ উৎপাদন করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে,
আয়ুর্বেদিক বা ইউনানি ওষুধের মূল শক্তি তাদের প্রাকৃতিক উপাদানভিত্তিক ফর্মুলায়। সেখানে কৃত্রিম রাসায়নিক ও অননুমোদিত উপাদান যুক্ত হলে তা শুধু চিকিৎসা নীতিমালার লঙ্ঘনই নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে আই,কে ল্যাবরেটরীজ (ইউনানি)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা পণ্যের মধ্যে রয়েছে— আরক ডাইকোপ্লেক্স (ফওলাদ সাইয়াল), আরক ডাইকোপ্লেক্স গোল্ড, নাইট্রিন (জিরিয়ানী),কার্ডিফেক্স সিরাপ,আইকে-ভিট সিরাপ,আইকে জিনসিন (শরবত জিনসিন) এবং বাসক সিরাপ।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো—আইকে জিনসিন (শরবত জিনসিন), শুক্রসুধা এবং কামিনী বিদ্রাবণ রসের মতো কিছু পণ্যে যৌন উত্তেজক ওষুধে ব্যবহৃত উপাদান সিলডেনাফিল সাইট্রেট মেশানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, আয়ুর্বেদিক বা ইউনানি ওষুধের নামে বাজারজাত এসব পণ্য সাময়িকভাবে ব্যবহারকারীর মধ্যে কার্যকারিতার অনুভূতি তৈরি করলেও এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে।
ক্ষণিকের উপকার, দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ বিপর্যয় ? স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত বা গোপনে মেশানো রাসায়নিকযুক্ত ওষুধ সাময়িক ফল দিলেও দীর্ঘমেয়াদে লিভার, কিডনি, হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালীর ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যদি কোনো ওষুধে ঘোষণাবিহীন রাসায়নিক উপাদান থাকে, তাহলে রোগী চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রায় তা গ্রহণ করতে পারেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আইকে-ভিট সিরাপে পশু মোটাতাজাকরণে ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে, যা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব অভিযোগ নতুন নয়। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জমা দেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভূমিকা নিয়েও। অভিযোগ রয়েছে, নথি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও মাঠপর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডকে আড়াল করে আসছেন। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
দেশে ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে অভিযান চললেও ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধের অভিযোগ আরও ভয়ংকর। কারণ খাদ্যে ভেজাল ধীরে ধীরে ক্ষতি করলেও ওষুধে ভেজাল সরাসরি মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদিত ওষুধের নমুনা সংগ্রহ করে স্বাধীন ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা, অভিযোগে নাম আসা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা তদন্ত এবং দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক, চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।