♦ ঢাকা ছিল মিছিলের নগরী ♦ হাত নেড়ে অভিবাদন তারেক রহমানের ♦ সেনা, পুলিশ, বিজিবি, সিএসএফ সহ নিশছিদ্র নিরাপত্তা
হারুন অর রশিদ হিরো:
অপরিমেয় প্রত্যাশার ভার নিয়ে জনতার মহাসমুদ্রে রাজসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ঘটেছে রাজনীতির রাজপুত্র বাংলাদেশের জননন্দিত নেতা তারেক রহমানের। দীর্ঘ ৬ হাজার ৩১৪ দিন পর ৮ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে উড়ে এসে তিনি নিজের দেশের মাটি স্পর্শ করলেন। আপ্লুত হয়ে হাতে তুলে নিলেন মাতৃভূমির এক মুঠো মাটি। ১৭ বছর আগে বাধ্য করা হয়েছিল তাঁকে প্রিয় মাতৃভূমি ছাড়তে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর একটিবার দেখা, আর তাঁর মুখের একটু কথা শোনার জন্য লাখ লাখ মানুষ তীব্র কনকনে শীত উপেক্ষা করে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে বসেছিল।
কখন আসবে প্রাণপ্রিয় নেতা তারেক রহমান। অতঃপর ১৭ বছরের শত সংগ্রাম শেষে পিতা স্বাধীনতার ঘোষক জিয়ার মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন নেতা। ছুটে গেলেন বসুন্ধরা স্মার্ট সিটির পাশে গড়ে তোলা সংবর্ধনা মঞ্চের এপাশ থেকে ওপাশে।
উপস্থিত জনতা তাঁকে অভিনন্দন ও স্বাগত জানাল। তিনিও দুই হাত উঁচিয়ে বারবার উষ্ণ অভিবাদন জানালেন অপেক্ষমাণ জনতাকে। পাল্টাপাল্টি এই অভিনন্দন আর অভিবাদনে ভরে গেল রাজধানীর পূর্বাচল রুটের ৩০০ ফিট সড়কের হৃদয়সমেত মাঠ। এ সময় সমাবেশস্থলে নেতা-কর্মীদের মাঝে মহামিলনের অপূর্ব মোহনায় একত্র হওয়ার বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ছিল লক্ষণীয়।
লাখো জনতার ভালোবাসায় সিক্ত হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। মঞ্চে জনতার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রিয় নেতাকে স্বাগত জানান দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ সময় তিনি তারেক রহমানের নেতৃত্বেই আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সংবর্ধনা মঞ্চে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সিনিয়র নেতা ছাড়াও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলের শীর্ষ নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের সঙ্গেও করমর্দন ও কুশলাদি বিনিময় করেন বিএনপির কান্ডারি তারেক রহমান।
বেলা ৩টা ৫০ মিনিটে গণসংবর্ধনাস্থলের মঞ্চে উঠে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত বিশেষ চেয়ার সরিয়ে রেখে সাধারণ একটি চেয়ার টেনে সেটায় বসেছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। জননন্দিত নেতা তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বিকালেই চার পাতার বর্ণাঢ্য বিশেষ বুলেটিন প্রকাশ করে বাংলাদেশ প্রতিদিন।
১১টা ৪০ মিনিটে বিমান নামল ঢাকায়
বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে দেশনেতা তারেক রহমানকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের (বিজি ফ্লাইট নং-২০২০) বোয়িং ৭৮৭-৯ মডেলের উড়োজাহাজটি সিলেট হয়ে এসে রাজধানীর হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরাসহ সিনিয়র নেতারা তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। দীর্ঘদিন পর দলীয় নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতে কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন তাঁরা। বিমানবন্দরে পরিবারসহ তারেক রহমানকে স্বাগত জানিয়েছেন বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরাসহ দলের সিনিয়র নেতারা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সালাহউদ্দিন আহমদ, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ড. আবদুল মঈন খান, মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমদ, বেগম সেলিমা রহমান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রমুখ। এ ছাড়াও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির কয়েকজন সিনিয়র নেতাকেও দেখা যায়। এরপর বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে বসেই তারেক রহমান টেলিফোনে কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে। সার্বিক সহযোগিতার জন্য প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন তারেক রহমান। এরপর ডা. জুবাইদা রহমান ও ব্যারিস্টার জাইমা রহমান বিমানবন্দর থেকে গুলশানের নতুন বাসায় চলে যান। এর আগে বুধবার মধ্যরাতে যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে ছেড়ে আসা বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটটি গতকাল সকাল ৯টা ৫৬ মিনিটে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। সেখানে যাত্রাবিরতি শেষে ফ্লাইটটি ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে।

হাতে-পায়ে স্পর্শ করলেন প্রিয় দেশের মাটি : দেশে ফিরে বিমানবন্দরেই খালি পায়ে বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিমানবন্দর থেকে দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে ভিআইপি গেট দিয়ে বের হয়ে পূর্বনির্ধারিত ‘লাল-সবুজ রঙের’ বাসে ওঠার আগে তিনি বিমানবন্দরসংলগ্ন বাগানে যান। সেখানে শিশিরভেজা ঘাসে খালি পায়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেশের মাটি স্পর্শ করেন তারেক। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর তিনি এক মুঠো মাটি হাতে তুলে নেন। এ সময় তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
বিমানবন্দর টু ৩০০ ফিট লোকে লোকারণ্য : তারেক রহমানের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে রাজধানীর বিমানবন্দর থেকে সভাস্থল রাজধানীর ৩০০ ফিট পর্যন্ত ছিল লোকে লোকারণ্য। লাল-সবুজের বাসটি বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিট সড়কের সমাবেশস্থলে যাওয়ার পথে সড়কের দুই পাশে লাইন ধরে প্রিয় নেতাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান দলীয় নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ। তিনি সহাস্যে হাত নেড়ে সবার অভিবাদনের জবাব দেন। এ সময় হাজার হাজার নেতা-কর্মীর উৎসবমুখর উপস্থিতি দেখা গেছে। স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয় রাজপথ। অনেকে সড়কে জায়গা না পেয়ে বাসের ছাদে উঠে তারেক রহমানকে দেখার চেষ্টা করেন। আবার অনেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রিকশা ভাড়া করে এনে সেটির ওপর দাঁড়িয়ে তারেক রহমানকে দেখে আনন্দে ফেটে পড়েন। তারেক রহমান বাসের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাত নাড়িয়ে সবাইকে শুভেচ্ছা জানান। বাসটি যতই ৩০০ ফিট সড়কের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, বিমানবন্দর সড়কে থাকা জনতা ও নেতা-কর্মীদের স্রোত প্রবাহিত হয় বাসের দিকে। কেউ নিজের ফোনে প্রিয় নেতার ছবি তুলে প্রাণ জুড়িয়েছেন, আবার কেউ তারেক রহমানকে একঝলক দেখে উল্লাসে মেতেছেন। যেন এই দিনটির জন্যই বছরের পর বছর অপেক্ষায় ছিলেন তাঁরা।