
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কমে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের মাঝে হু হু করে বাড়ছে তেলের দাম। তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা কিন্তু বলছেন, তেলের চেয়ে বড় বিপদ পানি সংকটই হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের পানিকে ‘কৌশলগত পণ্য’ হিসেবে দেখে সিআইএ। এই অঞ্চলে তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস নয়, বরং পানীয় জলই হলো প্রধান বিষয়।
তাপীয় পদ্ধতি
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি দপ্তরের মতে, পানিকে উত্তপ্ত করা হয় যাতে তা বাষ্পে পরিণত হয়। উত্তাপের কারণে লবণ, শৈবাল ও অন্যান্য অপদ্রব্য নিচে জমা হয়। পরে সেই বাষ্পকে পুনরায় তরল করা হয় এবং ব্যবহারযোগ্য পানি তৈরি হয়।
মেমব্রেন-ভিত্তিক পদ্ধতি
এতে বিশেষ ধরনের অর্ধভেদ্য ছাঁকনি ব্যবহার করা হয়। পানি ছাঁকনির মধ্য দিয়ে যেতে পারে, কিন্তু লবণ ও কঠিন অপদ্রব্য আটকে থাকে। মেমব্রেন-ভিত্তিক ডিসেলিনেশনের সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলো সাধারণত এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে, কারণ এটি জ্বালানি সাশ্রয়ী।
এই প্লান্ট সমুদ্রের জলকে পানীয় জলে রূপান্তর করে। এ জন্য এই পানিশূন্য অঞ্চলে সবুজ গলফ কোর্স, বড় ওয়াটার পার্ক এবং স্কি স্লোপ আছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি তাদের একটি বড় দুর্বলতাও। চার দশক পেরিয়ে গেছে। তবে এখনো সমুদ্রের জলকে পানীয় জলে রূপান্তর করা এখনো সাশ্রয়ী প্রযুক্তি হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এই প্লান্টগুলোর দুর্বলতা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে প্রয়োজনীয় তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মার্কিন সিআইএ কয়েক দশক ধরে নীতিনির্ধারকদের সতর্ক করে আসছে, এই প্লান্টগুলোর ওপর নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। ১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে একটি গোপন মূল্যায়নে সিআইএ উল্লেখ করেছে, ‘কিছু দেশের শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তারা জাতীয় কল্যাণের জন্য তেলের চেয়ে জলকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।’
উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার দেশগুলোতে প্রায় ১০ কোটি মানুষ বাস করে—সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমান। এই দেশগুলো এখন ইরানের আক্রমণের মুখোমুখি। কুয়েত, কাতার এবং ইউএই প্রায় পুরোপুরি ডিসেলিনেশন প্লান্টের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে দুবাইয়ের মতো মহানগরগুলোর জন্য। সৌদি আরবও, বিশেষ করে রাজধানী রিয়াদ, এই প্লান্টগুলোর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে। আন্তর্জাতিক আইনের আওতায়, ডিসেলিনেশন প্লান্টগুলো সুরক্ষিত। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সময় জেনেভা কনভেনশন কতটা কার্যকর তা প্রায়ই সীমিত হয়। সম্প্রতি ইরান ইউএই-এর ফুজাইরাহতে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম ডিসেলিনেশন প্লান্টগুলোর একটি চালু রাখে। কুয়েতে, ড্রোন আক্রমণের কারণে একটি প্লান্টে আগুন লেগেছে।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতার বিষয়ে। তারা বলছেন, যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে অঞ্চলে লক্ষ্য হতে পারে ‘ডিসেলিনেশন প্ল্যান্ট’, যেখানে সমুদ্রের লবণ ফিল্টার করে পানীয় জল তৈরি করা হয়। যদি এই প্লান্টগুলোতে হামলা, সাইবার আক্রমণ বা জল দূষণ ঘটে, তা শুধু বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। বরং তা মানবিক সংকট তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি পানীয় জল, বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তা হুমকিতে পড়তে পারে। জিসিসি দেশগুলো (সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, ওমান) বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ ডিসেলিনেটেড পানি উৎপাদন করে এবং এই অঞ্চলে ৪০০টির বেশি ডিসেলিনেশন প্লান্ট কাজ করে। কুয়েতের প্রায় ৯০ শতাংশ, ওমানের ৮৬ শতাংশ এবং সৌদি আরবের ৭০ শতাংশ পানীয় জল এই প্লান্ট থেকে আসে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রচণ্ড গরম, কম বৃষ্টিপাত, খনিজ পানির অভাব, তাই এই ব্যবস্থা ছাড়া শহর চালানো সম্ভব নয়।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার পরপরই ইরানের পরিবেশ সংস্থা এবং ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি তেহরানের বাসিন্দাদের বাড়িতে থাকার জন্য সতর্ক করে দিয়েছিল। তারা সতর্ক করেছিলেন, শহরের চারপাশে পাঁচটি জীবাশ্ম জ্বালানি স্থাপনায় বিমান হামলার ফলে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত রাসায়নিক এসিড বৃষ্টির কারণ হতে পারে এবং ত্বক ও ফুসফুসের ক্ষতি করতে পারে। এরপর সোমবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান, টেড্রোস আধানম ঘেব্রেয়েসাস বলেন, ‘ইরানের পেট্রোলিয়াম সুবিধাগুলোর ক্ষতি খাদ্য, পানি এবং বায়ু দূষিত করার ঝুঁকি তৈরি করে। এই ঝুঁকি বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের ওপর মারাত্মক স্বাস্থ্যগত প্রভাব ফেলতে।’ ইরানের উপস্বাস্থ্যমন্ত্রী আলী জাফরিয়ান আলজাজিরাকে বলেছেন, বিস্ফোরণের ফলে তেহরানের চারপাশের মাটি এবং জল সরবরাহ ইতিমধ্যেই দূষিত হতে শুরু করেছে।
ইরানের তেহরানে জ্বালানি তেলের গুদামে হামলার ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও ধোঁয়া থেকে অদ্ভুত ‘কালো বৃষ্টি’ হয়েছ। এই বিষাক্ত বৃষ্টিতে তেল ও ছাইয়ের মিশ্রণ থাকায় তা স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বলে সতর্ক করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বিজ্ঞানী ড. অক্ষয় দেওরাসের মতে, বোমা হামলার পরের কয়েক ঘন্টার মধ্যে তেহরানে যে কালো বৃষ্টিপাত হয়েছিল, তা ছিল বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট কালি এবং সূক্ষ্ম কণার মিশ্রণ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাসিন্দা সোফিয়া জানান, পানির ট্যাপ কখন খালি হয়ে যাবে এ ভয়ে তিনি রাতে ঘুমাতে পারেন না। সোফি জানান, আমরা মরুভূমির মধ্যে বাস করি। তেল বা গ্যাস অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হলেও, পানি আমাদের বেঁচে থাকার মূল ভিত্তি।’ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের উত্তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার উদ্বেগও বেড়েছে। সোফিয়া বলেন, ‘যদি আমি শত্রুপক্ষের স্থানে থাকতাম… আমি আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোকে লক্ষ্য করতাম। কখনো ভাবিনি পানীয় জল না পাওয়ার আশঙ্কায় পড়তে পারি।’ তিনি একা নন। পুরো অঞ্চলে উদ্বেগ বেড়েছে এই ভেবে যে, পানি সরবরাহ যুদ্ধের লক্ষ্য হতে পারে।
সম্প্রতি খবর এসেছে, বাহরাইনের একটি ডিসেলিনেশন প্লান্টে ড্রোন হামলা হয়েছে, যদিও সরবরাহ প্রভাবিত হয়নি। এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অভিযোগ করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র কেশম দ্বীপের ডিসেলিনেশন প্লান্টে আঘাত হেনেছে, যার কারণে ৩০টি গ্রাম পানি সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী আগেই সতর্ক করেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার ওপর হামলা পুরো অঞ্চলের জল দূষিত করতে পারে এবং কাতার, ইউএই ও কুয়েতের মানুষদের জীবন বিপন্ন করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কাতারের পানীয় জল শেষ হয়ে যেতে পারে মাত্র তিন দিনের মধ্যে। তাই জরুরি পানি সংরক্ষণের জন্য ১৫টি বিশাল জলাধার নির্মাণ করা হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, তেলের মতো, পণ্যের মতো পানি সহজে বিকল্প করা যায় না। পানি সরবরাহ ব্যাহত হলে তা জাতীয় নিরাপত্তার বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে, ডিসেলিনেশন প্লান্টে আক্রমণ বা ধ্বংস ঘটলে শহরের পানীয় জল সরবরাহ বন্ধ হয়ে মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে।
গবেষক লো বলেন, ‘এই দেশগুলো সমুদ্রের জল থেকে তৈরি কৃত্রিম পানির উৎপাদনে বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত।’ ডিসেলিনেশন এই অঞ্চলের জন্য একদিকে চমক, অন্যদিকে দুর্বলতা। ব্র্যান্ডেইস বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক নাদার হাবিবি বলেন, ‘এই প্লান্টগুলোর নিরাপত্তার ওপর এই অঞ্চলের অর্থনীতি এবং সংক্ষিপ্তমেয়াদি জনগণের বেঁচে থাকার ক্ষমতা নির্ভরশীল।’ কৌশল ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গবেষণা কেন্দ্র সিএসআইএস-এর পানি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ডেভিড মিশেল বলেছেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা আন্তর্জাতিক আইনের বিরোধী। তিনি আরো বলেন, ডিসেলিনেশন প্লান্টে আক্রমণ চালানো হলে তা উদ্বেগজনক উত্তেজনা সৃষ্টি করবে।’
বর্তমান যুদ্ধ এখনো উদ্বেগের বিষয় হলেও গবেষক লো মনে করেন, ভবিষ্যতের বড় ঝুঁকি হলো জলবায়ু পরিবর্তন। এটি শুধু ঘনঘন ও তীব্র ঝড় বা অন্যান্য চরম আবহাওয়ার কারণে উদ্ভিদের ক্ষতি নয়, বরং জ্বালানি ব্যবহার করে পানি উৎপাদন জলবায়ু সংকট বাড়িয়ে জলের ঘাটতি আরো তীব্র করবে। লো বলেন, ‘ডিসেলিনেশন ছিল বিংশ শতাব্দীর একটি বড় অর্জন, তবে এটি একবিংশ শতাব্দীর সম্ভাব্য জলবায়ু সমস্যার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।’ ইরান যুদ্ধে যদি ডিসেলিনেশন প্লান্টগুলোকে লক্ষ্য করা হয় বা হুমকি দেওয়া হয়, তাহলে আরব দেশগুলোকে পানি নিরাপত্তাকে জাতীয় বেঁচে থাকার সমস্যা হিসেবে মোকাবিলা করতে হবে। এটি তাদের সরাসরি সংঘর্ষে যুক্ত করতে বা প্রতিশোধ নিতে বাধ্য করবে। মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী যুদ্ধের ধারা তেলের কারণে নয়, বরং পানীয় জলের নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করবে। যারা এই অঞ্চলের পানির সরবরাহকে যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করার সাহস দেখাবে, তারাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে।
সম্পাদক : মোঃ মোশাররফ হোসাইন রাজু
প্রকাশক : হারুন অর রশিদ হিরো
মোবাইল: 01711-484208, 01726-702787 ইমেইল: dailybangladeshjuantor@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক বাংলাদেশ যুগান্তর. All rights reserved.