বাংলাদেশে ধর্ষণ:রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নাকি সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সংকট?
প্রতিবেদক-সালাহ উদ্দিন মিঠু: বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ার পর প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে: এটা কি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অস্ত্র, নাকি সমাজের গভীর কোনো সমস্যা? উত্তর এককথায় দেওয়া যায় না। তথ্য-উপাত্ত বলছে, দুটোরই উপস্থিতি আছে, কিন্তু মূল চালিকাশক্তি ভিন্ন।
তথ্য কী বলছে, আসক ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী ২০১৬-২০২৫ সালে গড়ে বছরে ১,০০০-১,৫০টি ধর্ষণের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মে পর্যন্ত ৭৪৯টি ঘটনা নথিভুক্ত। বাস্তবে অপ্রকাশিত ঘটনা আরও বেশি, কারণ কলঙ্ক ও ভয়ে অনেকেই মামলা করে না।
২০২৫ সালে ভুক্তভোগীর ৪০% এর বেশি ১৮ বছরের নিচে শিশু-কিশোরী।
২০১৮-২০২ সালে মামলার মাত্র ১.৭-২.৩% এ সাজা হয়েছে। দোষী সাব্যস্তের হার ৩-৪%। ৯৫টি ট্রাইবুনালে ১.৭৫ লাখ মামলা বিচারাধীন, ৪০ হাজার মামলা ৫ বছরের বেশি পুরোনো।
এই পরিসংখ্যান বলছে, ধর্ষণ বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং কাঠামোগত সমস্যা।
যুক্তি দিয়ে বললে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার উপাদান আছে কিছু ঘটনায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দেখা যায়, সংখ্যালঘু ও রাজনৈতিক বিরোধ।২০২৫ সালের প্রথম ৩ মাসে ১৩টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় ৪টি ধর্ষণ-নারী নির্যাতনের ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা বলছে, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলায় প্রায়ই নারীরা লক্ষ্যবস্তু হয়। মানবাধিকার কর্মীরা বলেন, ক্ষমতাশালী, রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত ব্যক্তিরা জড়িত থাকায় পুলিশ গ্রেফতার করে না বা জামিন সহজে হয়। HRW-এর রিপোর্টে পুলিশ ও “মাস্তান”দের দ্বারা যৌন নির্যাতনের উদাহরণ আছে। আইনমন্ত্রী বলেছেন, রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার হলেও ধর্ষণ-খুনের মতো জঘন্য মামলা প্রত্যাহার হবে না। এটা স্বীকার করে যে ধর্ষণকে রাজনৈতিক দরকষাকষির বিষয় করা হয়।
তবে এগুলো মোট ঘটনার ছোট অংশ। বেশিরভাগ মামলায় অভিযুক্ত পরিচিত ব্যক্তি – প্রতিবেশী, আত্মীয়, শিক্ষক।
মূল কারণ সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিক,বিশেষজ্ঞ ও গবেষণা অনুযায়ী প্রধান কারণগুলো অন্যতম
বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে মামলা ৫-১০ বছর ঝুলে থাকে। প্রমাণের অভাবে ৬০-৭০% মামলা খারিজ হয়। অপরাধী জানে শাস্তি পাবে না, তাই অপরাধ বাড়ে। পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব নারীকে নিম্নস্তরের দেখার সংস্কৃতি অনাক্রম্যতা তৈরি করে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম বলেন, ধর্ষণে জৈবিক চাহিদার চেয়ে ক্ষমতা প্রদর্শন বড় ভূমিকা রাখে।
সামাজিক কলঙ্ক ও ভয়ভীতি, ভুক্তভোগী ও পরিবার সামাজিক লজ্জা, প্রতিশোধের ভয়ে মামলা করে না। সাক্ষী সুরক্ষা আইন না থাকায় মামলা করতে সাহস পায় না।
আইন ও প্রয়োগের ঘাটতির ফলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০ আছে, ২০২০ সালে মৃত্যুদণ্ড যুক্ত হয়েছে। কিন্তু ফরেনসিক ঘাটতি, পুলিশি দুর্বলতা, সাক্ষী সুরক্ষার অভাবের কারণে প্রয়োগ হয় না। নৈতিক ও যৌন শিক্ষার অভাবে নতুন প্রজন্ম নৈতিকতা ও যৌন শিক্ষা থেকে দূরে থাকায় অপরাধের প্রতি অসচেতনতা বাড়ে।
রাজনীতি আর সামাজিক কারণের সম্পর্ক
রাজনৈতিক অস্থিরতা আইনশৃঙ্খলাকে দুর্বল করে, যা ধর্ষণের মতো অপরাধের সুযোগ বাড়ায়। ২০২৪-২০২৫ এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়েও ধর্ষণের ঘটনা ৮০-এর বেশি ছিল। কিন্তু এর মানে এই নয় যে সব ধর্ষণ রাজনৈতিক নির্দেশে হয়। বরং দুর্বল রাষ্ট্রযন্ত্র ও বিচারহীনতা অপরাধীদের সাহস দেয়।
ধর্ষণকে শুধু “রাজনৈতিক প্রতিহিংসা” বললে সমস্যার পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। রাজনৈতিক উপাদান আছে কিছু ক্ষেত্রে – সংখ্যালঘু নিপীড়ন, ক্ষমতাশালীদের ছাড় পাওয়া। প্রধান চালিকাশক্তি হলো বিচারহীনতা, পিতৃতন্ত্র, সামাজিক কলঙ্ক, এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। ধর্ষণ রাজনীতির অস্ত্র হতে পারে, কিন্তু এর শেকড় সমাজের গভীরে। সেই শেকড় না কাটলে শুধু রাজনীতি বদলালেও নারী-শিশুর নিরাপত্তা ফিরবে না।
লেখক - সালাহউদ্দিন মিঠু
সম্পাদক : মোঃ মোশাররফ হোসাইন রাজু
প্রকাশক : হারুন অর রশিদ হিরো
মোবাইল: 01711-484208, 01726-702787 ইমেইল: dailybangladeshjuantor@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক বাংলাদেশ যুগান্তর. All rights reserved.